আমি চেয়েছি শুধু মোহীনী।

আমি মলয় ব্যানার্জি(মলু)। কলকাতার এক নামী কলেজের শিক্ষক। পুরোনো জিনিস নিয়ে গবেষণা করা আমার কাজ,বিশেষ করে লিপি ও ভিন্ন পুথির শব্দের রূপান্তর করা ও রহস্য উন্মোচন করা আমার নেশা।আমার দিন ও রাতের বেশীরভাগ সময় ওইসব নিয়ে ঘাটাঘাটি করাতে চলে যায়। এককথায় আমাকে পুরোনো আমলের লোক ও বলতে পারেন। আমার ক্লাসের ছাত্র ছাত্রীরা খুব ভালো ও শান্ত স্বভাবের তবে নয়না বলে একটা মেয়ে আছে ক'দিন ধরে ওর আচরণে অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করি, যেন কোন দুশ্চিন্তা  তে আছে। তবে এই বাচ্চা মেয়েটি একদিন কলেজের ছাদ থেকে ঝাপ দিয়ে দিল। খবরটা নিউজ পেপার এ বেড়োলো তথ্যসূত্র ছিল ফেইসবুকের প্রেমিকের প্রতারণায় অতিষ্ঠ হয়ে  ছাত্রীর আত্মহত্যা, ছেলেটিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর জানা যায়  গোপন ভিডিও কল তথ্য ফাঁস করে দেবে বলে মেয়েটিকে ভয় দেখিয়ে টাকা নিচ্ছিলো। তবে মেয়েটি আর টাকা দিতে অক্ষম থাকায় আত্মহত্যা করে নেয়।    
আমি খবর টি পড়ে দুফোটা চোখের জল ফেলতে ফেলতে আমার এক বন্ধুর কাছে ফোন করে ফেইসবুক সম্পর্কে জানতে চাই ও সবকিছু বুঝিয়ে বলে। ওর সাথে দেখা করি ও আমাকেও একটা ফেইসবুক আইডি খুলে দেয়।
প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হলেও অন্ততঃ আমি পুরোপুরি বুঝে নিই যে ফেইসবুক জিনিসটা কি। আমি প্রায় রাত জেগে কাজ করি, আমার কলেজের ছুটি ছিল প্রায় তিন  দিনের তাই আমি ইচ্ছে করে কাজ কম্ম কে দূরে রেখে ফেইসবুক খুলে বসেছি।অনেকটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে এর মধ্যে অনেকেই আমার ছাত্র ছাত্রী। হঠাৎ একটা প্রোফাইল এ আমার চোখ আটকে যায়।

মোহীনি শিকাবত। আমি প্রোফাইল চেক করে দেখি মেয়েটি লেখালেখি করে,তবে ওর লেখাগুলো অনেকটা আমার পুথির মতো যার অর্থ সহজে বোঝা যায় না, আমি অনেক কষ্টে উদ্ধার করি ওর কিছুটা লেখার অর্থ, ওই মোহীনী কে মেসেজ এ পাঠিয়ে দিই। ও মেসেজ দেখে কোন রিপ্লাই করেনি। রাত দ'টোয়। মেসেজ করে মলয়বাবু আপনি কি করে বের করতে পারলেন এসবের অর্থ? আমি বললাম আমার ব্যাপারে সবকিছু। মোহীনিও নিজের ব্যাপারে অনেককিছু বলেছে,দুজনে অনেক সময় গল্প করি,যখন ই সময় পাই গল্প করি আমি পায়জামা পাঞ্জাবি ছেড়ে এখন শার্ট পড়ি, কলেজের অন্যরা বলে ছ্যার কে পুরো সুশান্ত সিঙ রাজপুত এর মতো দেখতে হিরো লাগে।আমার এখন নেশা টা জায়গা বদল করেছে এখন আমার মোহীনীর প্রতি নেশা। একঘন্টা কথা বলতে না পারলে আমার ভয় হয় মনে, আমি একদিন মোহীনী কে প্রপোজ করি,ওকে বিয়ে করতে চাই একথাটাও বলি তবে মোহীনী কোন উত্তর দেয়না, অনেকক্ষণ পরে একটা কথা বলে "
আমরা যা চাই তা সবসময় পাই না। কেননা তা পাবার আগেই অন্য কারো হয়ে যায়"!
আমি বলে দিই মজা করে ই পাব না কেন সব পাওয়া যায় শুধু পাবার ইচ্ছে থাকতে হয়। মোহীনী এই প্রথম বলে আমাকে যে মেসেনজারে কোল করো মলু।  ভিডিও কলটা ঝাপসা থেকে আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে আসে মোহীনী কে দেখি আমি ওর নামের সাথে ওকে ঠিক মানিয়েছে ও সত্যি সত্যি মোহীনী। ওকে স্পষ্ট করে দেখার পরে আমার বুকের বাপাশে একটা ব্যথা করছে। চোখ ছলছল করছে,মোহীনীর সিথিতে লাল সিদূর, কপালে লাল রঙের সিঁদুরের ফোটা ঝকঝক করছে, হাতে শাখা -পলা।

এই সবকিছু আমাকে যেন টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। আমি মোহীনী কে ভালোবাসি আমি ওকে দেখিনি তবুও অনেক স্বপ্ন সাজিয়েছি,ওর থেকে আর দূরে আমাকে থাকতে না হয় তাই আমি ওকে বিয়ে করে নেবো ঠিক করেছি ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে আমার ঘরটা মোটামুটি ঠিক ও করিয়েছি একটা লাল রঙের শাড়ী, কয়েকটা চুড়ি, সিঁদুরের কৌটো, একজোড়া নূপুর কিনে রেখেছি মোহীনী যখন আমার ঘরে হাটবে সমস্ত ঘর ওর নূপুর এর শব্দে ভেসে যাবে। একটা নতুন তানপুরাও কিনেছি কারণ একদিন বলেছিলো আমাকে ও তানপুরা বাজিয়ে গান গাইতে পছন্দ করে। আমি বড্ড স্বার্থপর হয়ে যায় মোহীনী কে নিয়ে আমি ওকে চাপ দিতে থাকি আমাকে বিয়ে করতে হবে, স্বামী বাচ্চা সবছেড়ে আমার সাথে থাকতে হবে। আমি একদিন পার্ক স্ট্রিট এ দেখা করতে ও বলি অনেক রিকোয়েস্ট করার পর মোহীনী আসে, আমার ইচ্ছে করেছিলো ওকে আমার ঘরে নিয়ে চলে যাই হাত ও একবার শক্ত করে ধরে নিয়েছিলাম তবে সে আমার গালে চড় মেরে চলে যায়। চলে যাবার সময় ওর পেছন ফিরে তাকানোর অপেক্ষা করছিলাম,মনে মনে বলছিলাম আমাকে ভালোবাসলে নিশ্চয় তাকাবে। তবে  ফিরে তাকাতে দেখিনি। রাতের বেলা ওর একটা পোষ্ট দেখে বুঝলাম ও তাকিয়েছিলো আমার হাত থেকে মোবাইল পড়ে যাবার কথা ও জানে কি করে এর অর্থ হল আমি মোবাইল টা যখন তুলেছিলাম তখন সে তাকিয়েছিলো। আমি মেসেজ করে অনেক ছরি বলি আমার অভদ্র আচরণ এর জন্য। মোহীনি এই বিষয়ে কোন কথা বলতে চায় না জানিয়ে দেয়। 


রাতে আমি আবার ভিডিও কল করি মোহীনীকে বলি কতটা ভালোবাসি। ওকে বিয়ে করতে চাই। ওকে এটাও বলি যে সমাজকে মেনে তো এতদিনে থেকে আসছি সমাজ কি জীবনে সুখ দিতে পারে? চলো না একটু সমাজের উর্ধে উঠে কিছু করি। তোমাকে ভালোবাসি তোমার সাথে একদিন দুদিন সেক্স করতে চাই না বা ওইসব যে বলে পরকীয়া ওইসব চাই না, আমি তোমাকে ভালোবাসি তোমাকে বিয়ে করে সারাজীবন তোমার সাথে থাকতে চাই। তুমি আমার থেকে বয়সে বড়ো এতে কি হয়েছে, তোমার বাচ্চা আছে এতে কি হয়েছে সবকিছু ভুলে তুমি আমার কাছে চলে এসো। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি মোহীনী। এই বলে আমার চোখ থেকে জল ঝড়ছিলো,আসলে আমারা ছেলেরা তো সহজে কান্না করি না। মোহীনী চুপ ছিলো ওর চোখ জলছল করছিলো যেন এক্ষুনি কেদে ফেলবে। মোহীনী নিজেকে সামলায় এরপর বলে "জীবনে আমারা যা চাই তা সবসময় পাই না। এই বলে ওর কাধ থেকে ব্লাউজ টা আস্তে করে নিচের দিকে একটু নামিয়ে দেয়,হলুদ মাখানো ফর্সা শরীরে রক্ত জমানোর দাগ। ঠিক যেন চাবুক দিয়ে মারলে যেমনটা হয় এইরকম ই, এরপর পেটের উপর থেকে শাড়ী ঠেলে দেখায় ঠিক নাভীর উপরে ওই চাবুকের আঘাতের দাগ। জায়গাগুলো যেন পচতে শুরু করেছে। আমার ইচ্ছে করছিলো ঔষধ লাগিয়ে মোহীনির আঘাতগুলো সারিয়ে তুলব।

মোহীনী বলে "ঔষধে আঘাত শরীরের সেরে ওঠে মনের না মলু"!আমি মোহীনী কে আবার ও অনুরোধ করে বলি যে আমার কাছে চলে আসতে, অনেক বার বলি তবে মোহীনী হ্যাঁ  বলেনি। মোহীনী বলে এটা আজকের শেষ কথা জীবনে আর কোনদিন কথা আমি তোমার সাথে বলব না। এইবার ভিডিও কল কাটার পর সবকিছু শেষ মলু। আমি আবার ও বলি মোহীনী চেষ্টা করো তুমি পারবে, মোহীনী বলে " ঠিক হয়তো চেষ্টা করলে আমি পারবো তবে একজন 'মা' পারবে না। আমি দীর্ঘ আঠারো বছর থেকে বিবাহিত জীবন যাপন করছি তবে কোনদিন সুখ শান্তি পাইনি।আট বছর আগে আমি মা হবার সুখ পাই আমার সন্তানের জন্য আমি বেচে আছি মলু। আমার নিজের জন্য আর কিছু চাওয়ার নেই। মনে আছে একদিন  মন্দিরে পূজা দিয়ে এসে তোমার সাথে কথা বলেছিলাম তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে আমি কি চেয়েছি?  ওই দিন  না বললেও আজ বলছি আমি সেদিন আমার সন্তান সুস্থ ভাবে বাচুক এটা চেয়েছিলাম।

  আর চেয়েছিলাম আমার মৃত্যু। ঈশ্বর এর  থেকে নিয়েছিলাম অনুমতি আবার কোন জন্ম নিলে তোমার হাত ধরে চলতে পারার। মলু আর কোনদিন সাক্ষাৎ হবে না !
তোমার কিছু স্মৃতি 
মনে গোপনে রাখি
 ঐখানে ইতি। 
ভিডিও কল কেটে যায়, আমি কল করি তবে যায় না আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। 
প্রায় একমাস কেটে গেছে তন্ন তন্ন করে খুজেছি তবুও পাইনি আমি। ওর কোন ঠিকানা জানা ছিলো না, আমি এতটা স্মার্ট ছিলাম না যে ওর ফটো রাখব আমার কাছে। আমি আর বাচতে পারছিলাম না। আমার সবদিকে শুধু মোহীনী।খাওয়া ঘুম সবকিছু যেন হারিয়ে গেছে, আমার আর কিছু ভালো লাগে না। অবসাদে ভুগতে ভুগতে একদিন আত্মহত্যা করে নিই। 
পরেরদিন খবরের কাগজে ছিলাম আমি :- পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে না পারার বিষাধে এক কলেজ শিক্ষক এর আত্মহত্যা। 
তবে সেই মহীলার কোন হদীস পাওয়া যায়নি। সুইসাইড নোট অনুযায়ী মলয়বাবু খুব ভালোবাসতেন সেই অজ্ঞাত নারীকে।।। এটা একতরফা আকর্ষণ ছিলো।

( গল্পটা পড়ে কেমন লাগলো কমেন্ট করে জানাবেন প্লিজ) 

(1) Comments
Write a comment